স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়নে সঠিক নীতিসহায়তা প্রয়োজন

অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়নে সঠিক নীতিসহায়তা প্রয়োজন

সঠিক নীতিসহায়তা, প্রণোদনা এবং কর সুবিধা স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা,গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়ন: বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এমন মন্তব্য করেন তারা।

ওয়েবিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চেম্বার সভাপতি রিজওয়ান রাহমান,এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল 

মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন এবং সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের সুদক্ষ নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে 

স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নত দেশে পরিণত হবে। তিনি জানান, বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সামনের দিনগুলোতে তা আরো বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে দেশের মানুষের মাঝে নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি আধুনিক 

সুবিধা সংবলিত যানবাহন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে। যেটি অটোমোবাইল খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

মন্ত্রী জানান, এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সহায়ক নীতিমালার খসড়া প্রস্তুতের কাজ

 করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। যেটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। পাশাপাশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এ খাতের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে শিল্প-কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসার জন্য দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান শিল্পমন্ত্রী। অটোমোবাইল খাতের সার্বিক উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম একান্ত অপরিহার্য উল্লেখ করে বলেন, এ লক্ষ্যে

 শিল্প ও শিক্ষা খাতের সমন্বয় খুবই জরুরি।

জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি বলেন, অনেক দেশের শিল্পায়নে অটোমোবাইল খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জাপানে এ খাত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অটোমোবাইল শিল্প উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের সেই উদাহরণ অনুসরণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি সমন্বিত নীতিমালা অপরিহার্য।

সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে জাপানি রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাতের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে হালকা প্রকৌশল শিল্পকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিত্সুবিশি বাংলাদেশে ‘সিকেডি প্লান্ট’ স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েছে। এ-বিষয়ক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান আছে। তিনি অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নে স্থানীয় হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশ একান্ত অপরিহার্য বলে মত 

প্রকাশ করেন।

ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, আমাদের অটোমোবাইল শিল্পে মূলত আমদানিনির্ভর রিকন্ডিশন গাড়ির প্রধান্যই বেশি। তবে জাপান, চীন ও ভারত থেকে কিছু নতুন গাড়িও আমদানি করা হয়, যার সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। তিনি জানান, কভিড পূর্ববর্তী সময়ে দেশের এ শিল্প খাত প্রতি বছর গড়ে ১৫-২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোটর ভেহিকলের নিবন্ধন কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালায় অভাব, সহায়ক শুল্ক কাঠামো না থাকা, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত 

কাঁচামালের জোগান না থাকা, দক্ষ মানবসম্পদ ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের অনুপস্থিতির কারণে আমাদের 

অটোমোবাইল শিল্পে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় ১০ বছর মেয়াদি ‘বাংলাদেশ অটোমোবাইল সেক্টর রোডম্যাপ ২০২১-২২’ এবং ‘অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং ডেভেলপমেন্ট পলিসি’র খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্তকরণ একান্ত 

অপরিহার্য পাশাপাশি গাড়ি নির্মাণের জন্য ব্যবহূত যন্ত্রাংশ তৈরিতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্য যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিতকণ,কমপক্ষে ৫-১০ বছর মেয়াদি সহায়ক শুল্ক নীতিমালা প্রদান, প্রবাসী বাংলাদেশীদের এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য পাঁচ বছরের কর অব্যাহতি প্রদান এবং এ খাতের গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতকল্পে ‘জাতীয় অটোমোবাইল কাউন্সিল’ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ‘জাতীয় অটোমোবাইল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল’ স্থাপনের প্রস্তাব করেন তিনি।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইফাদ গ্রুপ অব বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তাসকন আহমেদ। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু পুরোদমে চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধির ভালো সম্ভাবনা 

রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বিবিআইএন মোটর ভেহিকল অ্যাগ্রিমেন্টের কারণে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদাও বাড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, এ খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, জিডিপিতে যার অবদান দশমিক ৫ 

শতাংশ। তিনি বলেন, আমাদের ব্যবহূত গাড়ির মধ্যে ৫০ শতাংশ গাড়িই রিকন্ডিশন এবং নতুন গাড়ির সংখ্যা হলো ৫ 

শতাংশ।

তিনি বলেন, খসড়া আটোমোবাইল নীতিমালায় সরকার ব্যবহূত গাড়ি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের 

পরিকল্পনা নিয়েছে, যা আমাদের স্থানীয় অটোমোবাইল খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তাসকিন আহমেদ আরো বলেন, আমাদের দেশে বাণিজ্যিক গাড়ির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং 

সামনের দিনগুলোতে এ বাজার বৃদ্ধির আরো সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে অটোপার্টসের বাজার প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং বার্ষিক 

এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১২ শতাংশ।

ওয়েবিনারের আরো অংশগ্রহণ করেন মার্কিন দূতাবাসের ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান জন ডি ডানহাম, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

 (এমডি) মো. তৌহিদুজ্জামান, উত্তরা গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) 

মাতিউর রহমান এবং বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *